(ডা. আইমান ফাইলের দিকে না তাকিয়েই রোগীর হাঁটাচলা পর্যবেক্ষণ করছেন।)
ডা. আইমান : (গম্ভীর স্বরে) ওখানেই দাঁড়ান। চেয়ারে বসার আগে আর এক পা-ও এগোবেন না।
(রোগী চমকে থমকে দাঁড়ালেন।)
ডা. আইমান : আপনার হাঁটার ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে আপনার ফুসফুস কতটা আর্তনাদ করছে। আপনি সোজা হয়ে হাঁটতে পারছেন না, সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমরা একে বলি 'ট্রাইপড পজিশন' (Tripod Position)।
ডা. আইমান : এমন কেন হচ্ছে জানেন? কারণ আপনার বুকের পেশিগুলো এখন আর শ্বাস নিতে পারছে না, আপনি ঘাড় আর কাঁধের পেশি দিয়ে জোর করে বাতাস ঢোকানোর চেষ্টা করছেন।
রোগী: ডাক্তার সাহেব, আমি তো কিছুই বললাম না...
ডা. আইমান : আপনার বলার প্রয়োজন নেই। আপনার শরীর চিৎকার করে সব বলছে। আপনি যখন শ্বাস ছাড়ছেন, লক্ষ্য করুন, আপনি ঠোঁট গোল করে শিস দেওয়ার মতো করছেন (Pursed Lip Breathing)। কেউ আপনাকে এটা শেখায়নি, তাই না? আপনার অবচেতন মন বাঁচার তাগিদে এই কৌশল শিখে নিয়েছে যাতে ফুসফুসের ভেতর আটকে থাকা বাসি বাতাসটুকু বের করা যায়।
(ডা. আইমান রোগীর হাতের দিকে ইশারা করলেন, কিন্তু স্পর্শ করলেন না।)
ডা. আইমান : আপনার ডান হাতটা টেবিলের ওপর রাখুন। হ্যাঁ, তর্জনী আর মধ্যমা আঙুলটা দেখান।
(রোগী টেবিলের উপর হাত রাখলেন)
ডা. আইমান : (একটু হেসে) আপনার ফাইল বলছে আপনি ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু আপনার আঙুল বলছে আপনি মিথ্যা বলছেন—হয় আমার সাথে, নয়তো নিজের সাথে। ওই যে নখের কোণায় হলদে-বাদামী দাগটা দেখছেন? ওটা নিকোটিন আর আলকাতরার দাগ (Tar Stain)।
ডা. আইমান : ওটা সাবান দিয়ে ধুলে যায় না, ওটা চামড়ার গভীরে গেঁথে গেছে। চামড়া বদলাতে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ দিন সময় লাগে। আপনার দাগটা বেশ তাজা। তার মানে, আজ সকালেও আপনি অন্তত একটা বিড়ি বা সিগারেট খেয়েছেন, এবং সেটা ফিল্টার ছাড়া অথবা খুব শেষ পর্যন্ত টেনেছেন।
রোগী: (লজ্জ্বিত হয়ে) "আসলে ডাক্তার সাহেব...
ডা. আইমান : অস্বীকার করবেন না। প্রমাণ আরও আছে। আপনার হাতের কবজি লক্ষ্য করুন। মাংস নেই বললেই চলে। আপনার শরীর শ্বাস নেওয়ার শক্তি জোগাতে নিজের মাংসপেশি নিজেই খেয়ে ফেলছে (Muscle Wasting)। আপনি খাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু ওজন কমছে, তাই না?
(যেন একটা পিপা)
ডা. আইমান : "আপনার শার্টের ওপরের বোতামটা খোলা। ওখান থেকেই আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার বুকের হাড়গুলো। সাধারণ মানুষের বুক চ্যাপ্টা হয়, কিন্তু আপনার বুকটা ফুলে গোল হয়ে গেছে, যেন একটা ড্রাম বা পিপা (Barrel Chest)।
ডা. আইমান : ভরা লাগবেই। কারণ আপনার ফুসফুস বেলুনের মতো ফুলে গেছে কিন্তু বাতাস বের করতে পারছে না (Hyperinflation)। আপনি বাতাসের সাগরে ডুবে থেকেও অক্সিজেনের জন্য খাবি খাচ্ছেন। আপনার বুকের ভেতরে ছোট ছোট বায়ুথলিগুলো (Alveoli) ফেটে একাকার হয়ে গেছে। এটাকে আমরা বলি এমফাইসেমা (Emphysema)।
ডা. আইমান : এখন আমি আপনাকে শেষ সত্যটা বলব। আপনার কাশিটা শুকনো নয়। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর আপনি অনেকক্ষণ কাশেন এবং এক দলা কফ বের না হওয়া পর্যন্ত আপনার শান্তি লাগে না। আর সেই কফের রং সাদা বা কখনো কখনো পেকে হলুদ হয়ে যায়, বিশেষ করে শীতকালে।
রোগী: (বিস্মিত হয়ে) একদম ঠিক বলেছেন! আপনি কি জাদুকর?
ডা. আইমান : না, আমি জাদুকর নই। আমি কেবল পর্যবেক্ষক। আপনার শরীরে অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে, তাই আপনার নখগুলো গোলাপি না হয়ে একটু নীলচে (Cyanosis) দেখাচ্ছে। এখনই যদি আমরা সতর্ক না হই, এরপর আপনার পায়ে পানি জমবে, কারণ আপনার হার্ট আর এই চাপ নিতে পারছে না ।
(ডা. আইমান জোরে ফাইলটি বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। রোগীর মধ্যে স্পষ্ট আতঙ্ক। ঘরের পরিবেশ এখন ভারী ও গম্ভীর।)
ডা. আইমান : "শুনুন, আমি কোনো জ্যোতিষী নই। আপনার হাতের ওই হলদে দাগ, আপনার বুকের এই অস্বাভাবিক ফোলা ভাব, আর আপনার শিস দিয়ে শ্বাস ছাড়া—এগুলো সব সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আপনার ফুসফুসের ভেতরে একটা বড় অপরাধ ঘটে গেছে। আসল 'চোর' আপনার শরীরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
রোগী: (ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে) তাহলে এখন আমি কী করব স্যার? আমাকে কোনো ওষুধ দিন, সিরাপ দিন... যাতে কাশিটা কমে যায়।
ডা. আইমান : (দাঁড়িয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে) ওষুধ? ফার্মেসির দোকানদার আপনাকে ১০ টাকার সিরাপ দেবে, তাতে কাশি হয়তো দুদিন কমবে, কিন্তু চোর মরবে না। এই রোগটা সাধারণ কাশি নয়, এর নাম সিওপিডি (COPD)। আগে এই চোরকে ধরতে হবে। এক্স-রে তে সব ধরা পড়ে না, আপনার এই টেস্টটি দরকার।
ডা. আইমান : প্রিয় দর্শক, আপনারা দেখলেন—শরীরের ছোট ছোট লক্ষণ কীভাবে বড় রোগের সংকেত দেয়। ফার্মেসির দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা সিরাপ খেয়ে এই সংকেতগুলো ধামাচাপা দেবেন না। শরীর কখনো মিথ্যা বলে না।
ডা. আইমান : আপনার বা আপনার পরিচিত কারো যদি দীর্ঘদিনের কাশি বা শ্বাসকষ্ট থাকে, তবে আজই একজন এমবিবিএস ডাক্তার বা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। নিজে ডাক্তার হবেন না, ইন্টারনেটের ভিডিও দেখে ওষুধ খাবেন না। সচেতনতাই আপনার প্রথম চিকিৎসা।
ডা. আইমান : শেয়ার করে আপনার প্রিয়জনকে এই নীরব ঘাতক সম্পর্কে সতর্ক করুন। সুস্থ থাকুন, নিঃশ্বাস নিন প্রাণভরে।